Indigo Farm and Revolt of Kumarkhali PDF Print E-mail
Written by Administrator   
Tuesday, 22 July 2008 02:12

কুমারখালীর নীল চাষ ও নীল বিদ্রোহ

১৭৭৪ খ্রীষ্টাব্দে লুই বান্নো নামক একজন ফরাসী যুবক বাংলাদেশে প্রথম নীলচাষ আরম্ভ করার পরের বছর ক্যারল ব্লুম নামক একজন ইংরেজ নীলকুঠি স্হাপন করেন। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সনদে ইউরোপিয়ানরা এদেশে জমি ক্রয় ও চাষের অনুমিত পায়। এর ফলে কুষ্টিয়াতে নীল কোম্পানীর আবির্ভাব ঘটে। ১৮৫৪ সালে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডানবারের উল্লেখ থেকে জানা যায় যে, নীল করেরা ভাল জমিদে কম মুজুরী দিয়ে চাষীদের নীল চাষে বাধ্য করতো।


বাংলাদেশে বছরে কুড়ি লক্ষ চল্লিশ হাজার একর জমিতে প্রায় বার লক্ষ আশি হাজার মণ নীল উতপন্ন হতো। কুমারখালী কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটি যথেষ্ট উর্বর থাকায় এখানে নীল উতপন্ন ভালো হতো। এ কারণে নীলকরেরা এ অঞ্চলে নীল চাষের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিত। সমগ্র নদীয়ায় সতের হাজার ছয়শত বিঘা জমিতে সাতশত মণ নীল উতপন্ন হতো। এর মধ্যে কুমারখালী কুষ্টিয়া অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী নীল উতপন্ন হতো। এ দেশের নীল চাষের ইতিহাস বড়ই নির্মম ও বেদনাদায়ক। নীলকরদের অত্যাচার ও নিপীড়ন বাংলার মানুষের মন থেকে মুছে যাবার নয়।


প্রতি বিঘা জমিতে নীলচাষে খরচ হতো দশ টাকা অথচ নীলকরেরা মূল্য দিত সারে তিন টাকা। চাষীরা নীল চাষে নীলকরদের অত্যাচার সম্পর্কে অনেক ভয়াবহ কাহিনী বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণ অনেক গ্রন্হেই উল্লেখ করেছেন। প্রতিটি নীল কুঠিতেই চাষীদের শাস্তি দেবার জন্য নির্দিষ্ট কুঠুরী থাকতো। অত্যাচারের কাজে নীলকরদের কুঠিয়াল বাহিনী নিযুক্ত থাকতো। ইংরেজ নীলকরগণ কুমারখালী কুষ্টিয়ার চাষীদের জমি জোরপূর্বক দাদন লিখে নিয়ে কোন অর্থ না দিয়ে তাদের গরু-লাঙ্গল দ্বারা জমি চাষ করে তাদের দ্বারাই নীল চাষ করাতো এবং তাদের দ্বারাই কাটানো পচানো ইত্যাদি করে নীল তৈরি করে নিত। কখনও অবাধ্য নীল চাষীকে অপহরণ করে হত্যা করত। কখনও অবাধ্য নীল চাষীকে কুঠীতে ধরে এনে হাত পা বেধে মাথার উপরে মাটি দিয়ে তার উপরে নীলের বীজ বপন করে গাছ বের না হওয়া পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখতো। নীল বিদ্রোহের কয়েক বছর আগে একজন ইংরেজ ম্যাজিষ্ট্রেট এক ধর্মযাজকের কাছে বলেছিলেন, "এমন এক বাক্স নীল বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে আসে না যা বাংলার মানুষের রক্তে রঞ্জিত নয়"। নীল কমিশনের নিকট প্রদত্ত সাক্ষ্যে বারাসতের ম্যাজিষ্ট্রেট এ্যাসলী ইডেন নামক একজন ইংরেজ কর্মকর্তা বলেছেলেন, "খুন, জখম, দাঙ্গা, ডাকাতি, লুণ্ঠন, অগ্নি-সংযোগ, মানুষচুরি প্রভৃতি এমন কোন অপরাধ নাই যা নীলকরেরা করে নাই"। তাই বাংলায় নীল চাষের ইতিহাস বড়ই করুণ ও বেদনাদায়ক। কুমারখালীতে অনেকগুলো নীলকুঠি গড়ে উঠেছিল। শালঘর, মধুয়া, শিলাইদহ, আমবাড়িয়া, ধোকরাকোল, খোরশেদপুর, হুগলা, জগন্নাথপুর, এদরাকপুর, দয়রামপুর, গঙ্গা ধারদিয়া, সদকী, কুমারখালী। নীল কুঠি ছাড়াও কুমারখালীতে রেশম কুঠি ও সদকী একটি চিনি কুঠি ছিল। এ সমস্ত কুঠির নীল করেরা সবাই ছিল অত্যাচারী। টামাস আইভ্যান, ফেনী, ফারগুসান, সেলী ক্রুফোর্ড, স্টিফেনশন, সিমসন প্রমুখ অত্যাচারী নীলকরদের কয়েকজন। কুমারখালীর গৌরবোজ্জ্বল মানুষ এ সমস্ত অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ করেছে, কুঠী আক্রমণ করেছে। টি,আই কেনী বাংলার অত্যাচারী নীলকরদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর ছিল। শালঘর, মধুয়ায় কেনির কুঠীর ছিল। তার অত্যাচারে আশে পাশের গ্রামের বহু পরিবার বাড়ী ঘর ভিটা মাটি ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। কেনির এই অত্যাচারের কাহিনী বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের গ্রন্থে দেখতে পাওয়া যায়(দ্রঃ মীর মোশাররফ হোসেন লিখিত জমিদার দর্পণ নাটক ও উদাসীন পথিকের মনের কথা)।

মহিলা জমিদার প্যারী সুন্দরীর জমিদারী এলাকায় কেনির কুঠি থাকায় প্রজাদের দুঃখ-কষ্টে প্যারী সুন্দরী ব্যথিত হন এবং কাতর হয়ে পড়েন। তিনি প্রজাদের উপর কেনির অত্যাচার বন্ধ করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এবং কেনির সাথে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ১৮৫০ সাল থেকে কেনির বাগদী লাঠিয়ালদের সঙ্গে তার প্রজাদের অনেকগুলো সংঘর্স হয়। এসব সংঘর্সে চাষীরা হেরে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে প্যারী সুন্দরীর নেতৃত্বে কেনির আমলা কুঠিতে আক্রমণ করে জয়লাভ করেন। এ কারণে কেনির হুকুমে বাগদী লাঠিয়াল বাহিনী প্যারী সুন্দরীর ভাওল গ্রামের কাচারী লূঠ করে। টি আই কেনি তার নিরাপত্তার জন্য পাবনা  থেকে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও মামুদ বক্স নামে একজন দারোগার অধিনে কয়েকজন পুলিশ শালঘর মধুয়ার কুঠিতে নিয়োজিত রেখেছিলেন। কেনির বিরুদ্ধে প্যারী সুন্দরীর নেতৃত্বে বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী শালঘর মধুয়ার কুঠি আক্রমণ করেন। এ সময়ে কেনি কুঠিতে ছিল না। এ আক্রমণে দারোগা, মামুদ বক্স নিহত হন। আর ইংরেজ ম্যাজিষ্ট্রেট পালিয়ে জীবন বাঁচায়। নীলকরদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ছিল খুবই শক্তিশালী দেশ কাপানো। এ সময়ে নীলচাষীরা বৃটিশ সরকারকে খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয়। বৃটিশ সরকার বিচলিত হয়ে এই ঘটনা তদন্তের জন্য ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের জি জি মরিসকে একদল সৈন্যসহ শালঘর মধুয়ায় পাঠায়।  তিনি এখানে ছাওনীকরে ঘটনার তদন্ত করেন। প্রজারা কেনির লোমহর্ষক অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করে জানায়, এই অত্যাচার বন্ধ করলে খাজনা দিতে আমাদের আপত্তি থাকবে না। তদন্ত শেষে জি জি মরিস সৈন্যসহ কলকাতায় ফিরে যায়। বাংলার তদানীন্তন লেঃ গভর্নর স্যার জেপি গ্রান্ট সাহেবের নিকট রিপোর্ট পেশ করেন। গ্রান্ট সাহেব কলকাতা থেকে নীল হাঙ্গামা নিরসনের উদ্দেশ্যে জাহাজ যোগে কুমার নদী দিয়ে পাবনা যাবার পথে কুমার নদীর দুই পারে লক্ষ লক্ষ কুমারখালী কুষ্টিয়ার অত্যাচারিত মানুষ গভর্ণরের কাছে নীল চাষ বন্ধের জন্য কাতরভাবে আবেদন জানায়। প্রজাগণ জেপি গ্রান্ট সাহেবের জাহাজ থামাতে ব্যর্থ হয়ে নদীতে ঝাপ দেয়। গ্রান্ট সাহেব জাহাজ থামিয়ে প্রজাদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের দাবী-দাওয়া পেশ করবার জন্য পাবনা যেতে বলেন। পাবনায় নীর চাষীদের বিশাল সম্মেলন হয়। এ সম্মেলনে জেপি গ্রান্ট সাহেব ঘোষণা করেন নীল চাষ বাধ্যতামূলক করা যাবেনা। চাষীরা স্বাধীন মত ফসল চাষ করবে, কেহ জোর পূর্বক নীল চাষ করালে তাকে কঠোর শাস্তি নিতে হবে। এই ঘোষণায় প্রজারা অত্যন্ত খুশী হয়ে বাড়ি ফিরে মাঠের সমস্ত নীল কেটে গড়াই, কুমার ও কালীগঙ্গা নদীতে নিক্ষেপ করে। পাবনায় এ সম্মেলনে কুষ্টিয়াকে মহকুমা ঘোষণা করা হয়। কুমারখালীর শালঘর মধুয়ার এই বিদ্রোহই বাংলার নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে কুমারখালীর এটি একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত।

মোঃ শমসের আলী প্রাঃ ও মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন

স্ণরনিকা
১২৫তম বর্ষপূর্তি(১৮৬৯-১৯৯৪)
কুমারখালী পৌরসভা, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ

 

মোঃ শমসের আলী প্রাঃ ও মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন

 

Last Updated on Saturday, 29 November 2008 07:04