"এ না হলে কিসের কবি,
কিসের ছবি আঁকিয়ে?
ফুলের ছবি আঁকব আমি
গাছের দিকে তাকিয়ে।"
রবীন্দ্রনাথের রচনা বলে মনে হলেও রবীন্দ্রভক্তদের নিরাশ করে জানাই, চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উদ্ধৃত স্তবকটি এই অধমের রচিত একটি কবিতার অংশ। ফুলের দিকে তাকিয়ে গাছের, বা গাছের দিকে তাকিয়ে ফুলের ছবি আঁকার কাজটাই হচ্ছে চিত্রশিল্পীর কাজ। সেই কাজটা বাস্তবে না হোক, মনে মনে হলেও যে একসময় আমি গ্রহণ করেছিলাম, উদ্ধৃত কাব্য-স্তবকটির ভেতরে তার কিঞ্চিৎ প্রমাণ বিদ্যমান। স্তবকটি চিত্রশিল্প সম্পর্কে আমার ধারণারও প্রকাশক বটে। (দ্র: "আমি যখন বড় হবো", সোনার কুঠার, প্রকাশকাল ১৯৮৭)
চিত্রশিল্প সম্পর্কে আমার ভেতরে আগ্রহ থাকার পরও, আমি এ কাজে সত্যিকার অর্থে যাকে হাত দেওয়া বলে, তা দিইনি। কেন দিইনি, তার ব্যাখ্যাও আমার জানা নেই।
আমার জানা না থাকলে কি হবে, যাঁর জানাটা গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ঠিকই জানতেন। তিনি যে কোন অছিলায় কার মাধ্যমে কখন কোন তারবার্তা পাঠান, তা কেউ জানে না। এবার যাঁর মাধ্যমে আমি তাঁর তারবার্তা পেয়েছি, তাঁর নাম নাসির আলী মামুন, আলোকচিত্রের কবি। মামুনের আগ্রহে মাঝে মাঝে ছোট আকারে ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি। মামুন আমাকে বাধ্য করেছে। শুধু আমাকে নয়, আরও অনেককেই। ১৯৭৪ সাল থেকে ছবি তোলার নাম করে মামুন আমার পিছু নিয়েছে। শুধু আমার ছবি তুলেই আমার পিছু ছাড়েনি সে, আমার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা শিল্পীটিকে বারবার সে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সিগারেটের প্যাকেটে, দেশলাইয়ের খোলে বা কোনো দলছুট কাগজের পাতায় আমার আঁকা, ভালোমন্দের দ্বন্দ্বের ভেতর থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসা ছোট ছোট ছবি নাকি ওর কালেকশনে রয়েছে। আমার অপচেষ্টার স্নৃতি হিসেবে সেগুলো সে সযতনে রক্ষা করে চলেছে জানি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, ওর গোপন সঞ্চয়ে হানা দিয়ে ওগুলো ধ্বংস করে দিয়ে আসি। কিন্তু তা আর সম্ভব বলে মনে হয় না। মামুন ওর স্বপ্নের ফসল ফটোজিয়ামে বিখ্যাতজনের অখ্যাত কীর্তিসমূহ সংরক্ষণ করবে বলেই মনে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ তখনকার তরুণ কবি অমিয় চক্রবর্তীর খাতায় কী একটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। ওই ছবিতে তিনি স্বাক্ষর করেননি। স্বাক্ষর চাইলে রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে ওই ছবিটি ছিঁড়ে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন। মৈত্রেয়ী দেবীকে উপহার দেওয়া একটি অসুন্দর ছবি মৈত্রেয়ী দেবীর অ্যালবাম থেকে অপসারণের গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর মংপু ভ্রমণের কথাও আমরা জানি। আমার মধ্যেই বা তার অন্যথা হবে কেন?
এত দিন তবু যা হোক ছোট চিরকুটাকৃতির ভেতরে আবদ্ধ ছিল আমার ছবি আঁকার একান্ত জগৎ। কবিতার বিপরীতে "ছবিতা" হয়ে ওঠার প্রয়াস সে করেনি। কিন্তু সম্প্রতি তারই আভাস পাচ্ছি যেন। নাসির আলী মামুন নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে রংতুলি দিয়ে আমার কামরাঙ্গীরচরের নির্জন নিবাসে কতিপয় আমলার স্ত্রীর মতো সাদা ক্যানভাসের সামনে আমাকে বসিয়ে দিয়ে আমেরিকা সফরে গিয়েছে।
বেশ কিছুকাল রংতুলি ও ক্যানভাসগুলো খাটের নিচে ফেলে রেখেছিলাম। তারপর ওদের নিরন্তর আহ্বানে সাড়া দিয়ে একসময় অধরাকে ধরা দিয়েছি। লেখার পুরোনো জগৎ পাশে ঠেলে রেখে আমি আশ্রয় নিয়েছি রং ও রেখার নতুন জগতে। বেশ কাটছে আমার সময়। মনে হচ্ছে, ভুবন ভ্রমিয়া শেষে সত্যি সত্যিই বুঝি এবার এলাম নতুন দেশে।
আমি সরলরেখা আঁকছি। বক্ররেখা আঁকছি। বৃত্ত আঁকছি। প্যারাবোলা আঁকছি। ফুল-ফল, পশু-পাখির বই কিনে এনেছি। চিত্রকলার পবিত্র মন্দিরে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি আমাকে। এখন আমার প্রশিক্ষণ চলছে।
আমার হাতের লেখা দেখে (আমার হাতের লেখা খুব খারাপ ছিল তা বলা যাবে না, কিন্তু তাঁর মতো সুন্দর ছিল না−এ কথা সত্য) আমার স্কুলজীবনের শিক্ষক নজর আলী স্যার প্রায়ই বলতেন, "এই সব কী কাউয়ার ঠ্যাং বগার ঠ্যাং লিখছস? যা, আবার লেখ।" আমাদের আবার লিখতে হতো। আমাদের ওই স্যার এখন লোকান্তরে। তিনি যদি জানতেন, তাঁর প্রিয় ছাত্রটি এখন ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে বসে সেই কাউয়ার ঠ্যাং ও বগার ঠ্যাং আঁকতে গিয়ে নিশিদিন কী গলদঘর্মই না হচ্ছে!
ইতিমধ্যে রং ও রেখার বিচিত্র সঙ্গমে ওর রেখে যাওয়া ক্যানভাসমন্ডলে যে চিত্রকলাসমূহের জন্ন হয়েছে, সেগুলো যদি শিল্পের রসিকমহলে সুকৃতির নিদর্শন হিসেবে গ্রাহ্য হয়, তবে তার প্রশংসার সিংহ-বাঘ নাসির আলী মামুনেরই প্রাপ্য হবে।
বলাবাহুল্য, কবিতার মতো ছবিতা রচনার ক্ষেত্রেও আমার প্রেরণার একটা বিরাট উৎস হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। আমার ছবিতা রচনার প্রয়াসের কথা শুনে আনিসুল হক তো লোভ সংবরণ করতে না পেরে বলেই ফেলল, আমার বর্তমান রোগটার নাম হচ্ছে রবীন্দ্র-সিনড্রম। রবীন্দ্রনাথও যে আমার বয়সেই চিত্রকলার কলার দিকে ঝুঁকেছিলেন, সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাকে সে কাবু করতে চাইল। রবীন্দ্র-সিনড্রম কথাটা যে নবনীতা দেবসেনের, ওর নিজের নয়, সে কথাও সে আমাকে জানাল একপর্যায়ে। তার পরও আমি কাবু হতে রাজি হলাম না।
এই যে আমি রবিপ্রভার কাছে কাবু হতে রাজি হলাম না, তার কারণ আছে। ছবি আঁকায় আমাকে প্রাণিত করার জন্য মামুনের ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল সাপোর্ট প্রদানের কারণে নয়, মনে হয় আমার সাম্প্রতিক প্যারিস-ভ্রমণ এ ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করেছে। সম্ভবত বিশ্বসেরা চিত্রশিল্পীদের কাতারে নিজেকে কল্পনায় দেখার গোপন বাসনাকে উসকে দিয়েছে প্যারিস। বলা হয়, খালি হাতে অনেকেই প্যারিসে যায়, কিন্তু সেখান থেকে খালি হাতে কেউই ফেরে না। কথাটা আমার বেলাতেই বা মিথ্যে হবে কেন? কাছে থেকে প্যারিসপ্রবাসী শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ছবি আঁকা দেখার বিষয়টাও ও আমাকে বেশ ভাবিয়েছে।
১৯৩০ সালের ২ মে, প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "মাই পোয়েট্রি ইজ ফর মাই কান্ট্রিম্যান, মাই পেইন্টিংস আর মাই গিফট টু দ্য ওয়েস্ট।" অর্থাৎ আমার কবিতা হচ্ছে আমার দেশবাসীর জন্য, আমার ছবি হচ্ছে পাশ্চাত্যের মানুষের জন্য আমার উপহার। প্রেস বিজ্ঞপ্তি। মিউনিখ, জুলাই ১৯৩০।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর দেশবাসী তাঁর কবিতাকে যেভাবে অন্তরে গ্রহণ করেছে, পাশ্চাত্যের মানুষ তাঁর ছবিকে সেভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে কবি হিসেবে সমগ্র বিশ্ব কর্তৃক সমাদৃত হলেও বিশ্বকবির আঁকা প্রায় আড়াই হাজার শিল্পকর্ম শেষ পর্যন্ত তাঁর দেশবাসীর বিস্নয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। কিছুটা কৌতুহল জাগাতে সক্ষম হলেও পাশ্চাত্যের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রশিল্পীদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাম যুক্ত করতে পারেননি।
আমার কথা হচ্ছে, যে মাধ্যমটিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর দুর্বলতার নিদর্শন রেখে গিয়েছেন, তাকে অনধিগম্য ভাবার কোনো যুক্তিসংগত কারণ দেখি না। তিনি কবিতা লিখেছেন জেনেও আমি যদি কবিতা লিখতে কুন্ঠিত বোধ না করি, তবে তিনি ছবি এঁকেছেন বলেই আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব কেন? তাঁর কবিতা তিনি লিখেছেন, তাঁর ছবি তিনি এঁকেছেন। আমার কবিতা যতটা আমার, আমার ছবিতা যদি ততটা আমার হয়, তাতেই আমি খুশি। রবীন্দ্রনাথের ভাবনাজগৎ শুধু আমার কবিতার মধ্যে নয়, আমার চিত্রকলার মধ্যেও নবজীবন লাভ করুক। "রুচির দাসত্ব নয়, মননের মুক্তি হলো প্রকৃত আধুনিকতা। ইউরোপের স্কুলমাস্টারদের অভিভাবকত্বে বেড়ে ওঠা নয়, চিন্তার ও কাজের স্বাধীনতা অর্জন করাই আধুনিকতা।" আধুনিকতা সম্পর্কে উদ্ধৃত রবীন্দ্রভাষ্যটি অনেকের মতো আমার জন্যও প্রেরণাদায়ক।
১৮৪১ সালের ২৫ বৈশাখ পিতামাতার চতুর্দশ (ত্রয়োদশও হতে পারেন) সন্তান হিসেবে জন্নগ্রহণকারী রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে ১৯৩৬ সালে কলকাতায় প্রদত্ত একটি ভাষণে আক্ষেপ করে বলেছিলেন,..."যুদ্ধোত্তর এই হতাশার যুগের পক্ষে আমি অনেক আগে জন্ন নিয়েছি।" ("আই ওয়াজ বর্ন টু আর্লি ফর দিস পোস্ট-ওয়ার এজ অফ ডিজইল্যুশনমেন্ট")
যুদ্ধ-পরবর্তী যুগের "ডিজইল্যুশনমেন্ট" বলতে তিনি ঠিক কোন বিষয়টিকে বুঝিয়েছিলেন জানি না, তবে তাঁর বিবৃতির প্রথম অংশটিকে আমি খুব সত্য বলেই স্বীকার করি। আমার সময় জন্নগ্রহণ করলে রবীন্দ্রনাথ হতে পারতেন আমার শ্রেষ্ঠ বান্ধব।
View this article as Image.
Resource: Anno Alo - 08-05-2009, Borsho-11, Sonkha-179.
|