|
Wednesday, 17 December 2008 |
ওয়াহাবী আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা কাজী মিয়াজান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর পার্শ্ববর্তী দুর্গাপুর গ্রামে উনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পূর্বপুরুস খোকসা-জানিপুরে বাস করতেন বলে জানা যায়। কাজী মিয়াজাস বাল্যকালে সামান্য ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। জমিদার, নীলকর, জোতদার ও মহাজনের অত্যাচার ও শোষণে মুসলমানদের চরম দুর্গতি দেখে তিনি ব্যথিত হন। তাঁর সমসাময়িককালে কুমারখালী অঞ্চলে অধিকাংশ মুসলমান স্বধর্ম ভুলে হিন্দুদের লক্ষীপূজা, গাজন উতসব, শীলাদেবীর গূজাসহ বহু ইসলাম বিরোধী কাজে অভ্যস্ত ছিল।
মুসলমান সমাজে শিক্ষা না থাকায় তারা হিন্দুদের নামে নিজেদের ছেলেমেয়ের নামকরণ করতো। মোটকথা সহায় সম্পদহীন দরিদ্র মুসলমান শ্রেণীর চরম অধপতন দেখে কাজী মিয়াজান তাদেরকে জাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি কুমারখালী, খোকসা, কুষ্টিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে গোপনে ইসলাম প্রচার করে মুসলমানদের মধ্যে জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি করেন। তিনি একজন ধর্ম-সংস্কারক এবং ওয়াহাবী আন্দোলনের নেতা। কুষ্টিয়া জেলা থেকে তিনি ওয়াহাবী মুজাহিদ সংগ্রহ করে সীমান্ত প্রদেশে পাঠাতেন। এভাবে বহু অর্থ ও কয়েকশত মুজাহিদকে তিনি গোপনে সীমান্ত প্রদেশে পাঠাতে সমর্থ হয়েছিলেন।১৮৬১ সালে ওয়াহাবী মুজাহিদ বাহিনীর সংগে ইংরেজ বাহিনীর এক প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। আফগানদের বিশ্বাসঘাতকতা সত্বেও বৃটিশ বাহিনী এই লড়িইতে পরাজিত হয়। এই ঘটনায় সমগ্র অবিভক্ত ভারতে ওয়াহাবীদের কার্যকলাপের ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়। ক্যাপটেন পর্সন আম্বালা থেকে দশজন ওয়াহাবী নেতাকে আটক করেন তাঁদের নিকট প্রাপ্ত কাগজ পত্রে কাজী মিয়াজানের নাম প্রকাশ পায়। অতঃপর ক্যাপটেন পার্সন কুমারখালী থেকে কাজী মিয়াজান সাহেবকে গ্রফতার করেন। আম্বালা মামলায় মোট এগারজন আসামীর মধ্যে কাজী মিয়াজান ছিলেন অন্যতম। সেসন কোর্টে মিঃ এডওয়ার্ডস সাহেবের এজলাসে তাঁদের বিচার হয়। আসামী পক্ষের মামলা পরিচালনার জন্য বৃটিশ সরকার চরম মুসলমান বিদ্বেষী মিঃ গ্লুডনকে উকিল নিযুক্ত করেন। ১৮৬৪ সালে ২রা মে এক রায়ে মৌলানা জাফর তানেশ্বরী, পয়াহিয়া আলি ও হাজী মুহাম্মদ শফিকে ফাঁসীর আদেশ দেওয়া হয়। পরে আপিলে তাঁদের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়। কাজী মিয়াজান সহ অপর আসামী মৌলভী আবদুর রহীম, এলাহী বক্স সওদাগর, ইসমাইল ভ্রাতৃদ্বয়, আবদুল গাফ্ফার ও মুন্সী আবদুল গাফ্ফার প্রমুখের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সকল সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। কাজী মিয়াজান ১৮৬৫ সালে আম্বালা জেলে ইনতেকাল করেন এবং তাঁকে জেলখানার পাশেই সমাহিত করা হয়।ওয়াহাবী অন্দোলনের অন্যতম নেতা কাজী মিয়াজান কুষ্টিয়ায় ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন। মাওলানা জাফর খান থানেশ্বরী তার গ্রন্থে কাজী সাহেব সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেনঃ "আমাদের মধ্যে তিনি(কাজী মিয়াজান) সর্বাপেক্ষ্য বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন অথচ খুব ধৈর্যশীল ও দৃঢ় চিত্ত ছিলেন।" ওয়াহাবীদের গোপন সংবাদ প্রকাশ করে সরকারী স্বাক্ষী হওয়ার জন্য তাঁর উপর প্রবল চাপ দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে অর্থসহ নানা পুরস্কারের লোভ দেখান হয়েছিল কিন্তু কাজী মিয়াজান অত্যন্ত ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কুমারখালী থেকে কাজী মিয়াজানকে গ্রফতারের সময় বৃটিশ সরকার এলাকার মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেছিল তা এই এলাকার একটি গ্রাম্য গানে প্রকাশ পেয়েছেঃ"নামাজ পড়ার ক্যামন ঠ্যালাজানে মিরজান কাজী,তাই দেখে সব কাছা দিলদেশের যত হাজী।সকলে দিল কাছাদিল না বাউল চাচা,ঢাল তলোয়ার ফেলারে ভাইহাল ধরেছে গাজী।"উপরোক্ত গ্রাম্য গানটিতে ওয়াহাবীদের প্রতি বাউলদের বিদ্রুপ থাকলেও ইংরেজ সরকার যে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেছিল সে সত্যটি অকপট ভাবে ধরা পড়ে। কুমারখালী অঞ্চলে তখন লালন ফকির বাউল গান দ্বারা বিরাট সংখ্যক লোককে বাউল করেছিলেন কলে মনে হয়। কাজী মিয়য়াজান মুসলমাদেরকে পুনর্জাগরণের যে চেষ্টা করেছিলেন তা ব্যর্থ হয় নাই। পরবর্তী কালে ইসলামী সংস্কার আন্দোলন কাজী মিয়াজানের পথ অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়েছিল।কুমারখালী অঞ্চল ছাড়াও সমগ্র কুষ্টিয়া জেলাতেই ওয়াহাবী আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করেছিল। ইতিপূর্বে তীতুমীরের প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলে এই আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার বাজিতপুরের মৌলানা মুহাম্মদ ইছহাক একজন ওয়াহাবী মুজাহিদ ছিলেন। এছাড়া কুমারখালী থানার আমবাড়ীয়া গ্রামের আফিরউদ্দিন ও আজিমউদ্দিন মোল্ল ওয়াহাবী মুজাহিদ ছিলেন। আফিরউদ্দিন বিশ্বাস (১৮৩০-১৮৮৮) এবং আজিমউদ্দিন মোল্লা (১৮২৫-১৮৭২) আম্বালার যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধের পর ব্যাপখ ধর-পাকড় আরম্ভ হলে তাঁরা পালিয়ে কয়েক বছর কাবুল ও কান্দাহারে কাটিয়ে দেশে ফিরে আসতে সমর্থ হন্ আজিমউদ্দিন মোল্লা নিজে বন্দুক তৈরী করতে পারতেন। তাঁর বাড়ীতে উক্ত যুদ্ধে ব্যবহৃত একখানি তরবারি ছিল। অবিভক্ত ভারতে নানা করণে ওয়াহাবী আন্দোলন ব্যর্থ হলেও মুসলমানদের পুনর্জাগরণ ত্বরাণ্বিত হয়েছিল একথা স্বীকার্য। কুষ্টিয়া জেলায় কয়েক হাজার মুজাহিদ ছিলেন। এইসব মুজাহিদের কোন ইতিহাস সংগৃহীত না হওয়ায় তাঁদের গৌরব পূর্ণঅবদান বিস্মৃতির অতল তলে হারিয়ে গেছে। তথ্য সুত্রঃ
কুষ্টিয়ার ইতিহাসশ. ম. শওকত আলী |