কুমারখালী পৌরসভার কথকথা কুমারখালী পৌরসভার প্রতিষ্ঠাব্দঃ ১লা এপ্রিল ১৮৬৯ইং মোতাবেক ১৮ই চৈত্র ১২৭৫ বঙ্গাব্দ। কুমারখালী দক্ষিণ বঙ্গের সুপ্রাচীন নগরী। নবাবী আমলের তুলসীগ্রাম। তার আরও আগের নাম ডাকচর। এই নগরীর উত্তরে ছিল এদরাকপুর নৌ চৌকি। বসবাস করতেন নবাবী আমলে এক জায়গীরদার। পাহারা দিতে হতো নৌপথ। সে পথ দিয়ে চলে যেত বড় বড় বজরা। হাজার ছিপের পালতোলা নৌকা।
আর সেই নৌকায় তোলা হতো হাড় গিলে পাখির পালক যার নাম COMMORCOLLY FEATHER. সুতী কাপড়, তুলা, রেশম, নীল, পাট, শাড়ি, তসরের চাদর। দক্ষিণে ছিল আর এক নদী, যে নদী পাবনা শহরের সাথে যশোহরের শৈলকুপা নগরীর মিলন ঘটিয়ে রাখতো। বজরা আর গহনার নৌকা চলে যেত ইছামতী নদী বেয়ে গৌড়ে, লক্ষণাবতীতে আবার কখনও বা সুবর্ণ গ্রামে। পূর্বে ছিল সাগর, সেই সাগরের তীরে ছিল কোটালীপাড়া নামক আর এক বিশাল নগর। আরও পশ্চিমে আর এক নৌ বন্দর হুগলী বন্দর। বড় সুনাম ছিল সেই নগরীর। সেই নগরীর মাঝদিয়ে এককালে পদ্মাও নাকি বহতা ছিল। আর সেই বহতা পদ্মা দেখেছিলেন তেলাদস্বামী, হিমালয়ের গুহায় ৫০০শত বতসর যিনি বেচেছিলেন। তিনি ভ্রমণ করেছিলেন এই দেশ। এই নদী দিয়ে বাবা খোরশেদ মুলুক যশোরের শৈলকুপা থেকে আসার পথে সেই নদী পাড়ি দিয়ে হাজির হয়েছিলেন খোরশেদপুর গ্রামে। নবাবী আমল শেষে কোম্পানীর আমল। ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার জন্য কুমারখালী নগরীতে কোম্পানী পাঠালেন তার COMMERCIAL RESIDENT, সেই রেসিডেন্ট কুমারখালী শহরে বাস করতেন। আজকের কুমারখালী থানার পাশে ছিল তার দ্বিতল ভবন। নাম শীতল কোঠা। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ঢাকা থেকে পদ্মা নদীর পথে মালামাল চালান দিত। সেই মালামাল পদ্মা হয়ে কালীগঙ্গা, কুমার, মাথা ভাঙ্গা নদী দিয়ে কলকাতায় পাঠাতো। আসাম থেকে মূল্যবান কাঠও যেত ঐ পথে। কোম্পানী আমল শুরুর প্রথম থেকে এখানে ছিল তাঁতের মিল। সেই মিল চলতো এখানকার সুতায়। স্হানীয় তাঁতীরা সেই তাঁতের মিল চালাতো। বাটিকামারা গ্রামেই সেই তাঁতীদের আবাস। এখানকার কাপড়ও মসলিন কাপড়ের মত সূক্ষ ছিল না। ইংল্যাণ্ডের ম্যানচেষ্টারে কাপড়ের মিল হবার পর তার DEMAND না থাকায় সেটা বন্ধ হয়ে গেল সম্ভবত ১৮১৯ সালের প্রথম দিকেই। ম্যানচেষ্টার থেকে কাপড় আনা শুরু হলে তাঁতের ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে যায় তখন ওয়াসেল সাহেবেরা বাটিকামারায় রেশমের কুঠির করেন। কাঙ্গাল হরিনাথের ভাষায় পতঙ্গ কুঠির, সেই কুঠিরে চাকরি করতেন প্যারী সুন্দরীর পিতা রামানন্দ সিংহ, মোহিনী মোহন চক্রবর্তীর পিতা নবকিশোর চক্রবর্তী। কায়েস্হ ও তন্তুরায় শ্রেণীর লোকদ্বারা কোম্পানী ওয়াসেল সাহেবদের কুঠির কিনে নিল। (তারপর পরিত্যাক্ত হলো পতঙ্গের কুঠি।)এখানকার তাঁতীদের তাঁতে তসর, মটকা, মটবী, প্রভৃতি সিল্কের চাদর, শাড়ি ভারত বিখ্যাত ছিলো। কিন্তু ওয়াসেল সাহেবরা কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে দিল সে কুঠির। কুঠিরের মালিক হলো কোম্পানী। কোম্পানী COMMERCIAL RESIDENT রাখলেন কুমারখালীতে। এদিকে ১৮১৫ সাল থেকে শুরু হলো নীল চাষ। কুঠি হলো কুমারখালীর জঙ্গলীতে। তারপর কেনীসাহেব কুঠি করলেন কুমারখালীর শালঘর মধূয়াতে। ছড়িয়ে পড়লো কুঠি কুমারখালী শহরে, ধুকরাকোলা, মহিষ বাথান, শিমুলিয়া, হিজলবট, শিলাইদহ, আমবাড়ীয়া, পাটিকাবাড়ী, ফুকবাড়ি, মাছপাড়া, হোগলা, জগন্নাথপুর, এদ্রাকপুর, দয়ারামপুর, পদ্মার ধার দিয়া নানান জায়গায়। কুঠিয়াল সাহেবদের জন্য তৈরি হলো কুমারখালী শহরে নীলের গোডাউন। এলাকার সর নীল বাণ্ডিল হয়ে আসতো কুমারখালীতে। তারপর কালীগঙ্গা, কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভাগীরথী হয়ে কলকাতায়। সেই ১৮১৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চললো এই রুপ। তখন কুমারখালী পাবনা জেলার মহকুমা। থানা-কুমারখালী, ভালুকা, পাংশা, বালিয়াকান্দি। আর তার পাশেই ছিল নদীয়া জেলার থানা কুষ্টিয়া, ভাদালিয়া নওপাড়া, দৌলতপুর। তারপর কুমারখলী গড়ে উঠলো নতুন ধাঁচের এক শহরে। শুরু হলো দ্রুত লোক বসতি। নানা জায়গা থেকে সাহা, মজুমদার, পাল তার সাথে বসাকরা এসে জড় হতে লাগলো কুমারখলীতে। তৈরী হল নানা ধরনের WIREI HOUSE, নীলের, পাটের, কাপড়ের, চালের, শুড়কি ইত্যাদি কল। আসাম থেকে আসা শুরু হলো মূল্যবান কাঠ। যশোহরের এলাকা থেকে হলুদ, চিনি। মারোয়ারী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাহেব ব্যবসায়ীর দল। শুরু হলো আড়তের ব্যবসা। কোম্পানীর রেসিডেন্ট সাহেব উইলিয়াম কুমারখালী শহরে দৈনিক বাজার বসালেন। শুরু হলো ইউরোপীয়ান ক্লাবের নীলকর, কোম্পানীর রেসিডেন্সির লোকজনের আনাগোনা। আর রেল লাইন বসানোর জন্য সাহেব-সুবার আগমন ঘটতে লাগলো কুমারখালী শহরে। তাদের হলো পৃথক ক্লাব। এদিকে নাটোরের মহারাজের সম্পত্তি নিলাম হলো। ইবরাহিম পরগনা খরিদ করলেন প্রিন্স দ্বারোকানাথ ঠাকুরের পালক পিতা রামলোচন ঠাকুর। রবীন্দ্রের পিতা দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর প্রায়ই আসতে লাগলেন এই অঞ্চলে। একদিকে SUB DIVISION TOWN ইংরেজ ক্যাপটেন সাহেব তার সেনাবাহিনী নিয়ে বসবাস করতে লাগলেন আজকে যেখানে উপজেলা ভবন সেই দুর্গাপুর অংশে। তার সাথে আবার ইংরেজ ডাক্তার, ক্যাপটেন ঠাকুর, বিপ্লবী বাঘা যতিন, ওহাবী আন্দোলনের বীর সেনা কাজী মিয়াজান, সাহিত্যিক আকবর হোসেন, রায় বাহাদুর জলধর সেনসহ অনেক মনীষীর সদম্ভ পদচারণা ঘটেছে এই কুমারখালীতে। তাছাড়া প্রচীন কাল হতে শিলাইদহের কুমারখলী কাপড়ের ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ। বর্তমানে বিসিক শিল্পকারখানা ও কুমারখালী পৌরসভা কার্যালয় ভাঙ্গনের দ্বার প্রান্তে উপনীত। শতাধিক বতসরের পুরাতন কুমারখলী এম. এন. উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল অংশ সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কুমারখালীর উচ্চ শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান কুমারখলী মহাবিদ্যালয়ের দুই তৃতিয়াংশ নদীগর্ভে নিশ্চিহ্ন প্রায়। বাকী অংশ নিয়ে নিরাভরণ নমণীর বিধ্বস্ত রূপ নিয়ে কীর্তিনাশের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। এ ছাড়া মসজিদ, মন্দির, দালান-কোঠা, গাছ-পালা, পুকুরসহ রায় বাহাদুর জলধর সেনের বাড়ি 'হিমালয়' ও রেবতী মোহনের বাড়ী মিলিয়ে প্রায় ৫০টি দ্বিতল বাড়ির কীর্তি নাশ করেছে কির্তিনাশা গড়াই। পৌর শহর কুমারখলী বস্ত্র ব্যবসার জন্য বিশিষ্ট স্হানের অধিকারী। কুমারখলীর বিছানার চাদর ও শীতের চাদর ক্রেতাদের মন হরণ করে অতি সহজেই। হৃদয়হরণকারী ইমারতগুলোর সৌন্দর্য আজ আর কোন পরিব্রাজকের মন কাড়ে না। হৃদয়ে আলোড়ন তোলে না এর কারুকার্য খচিত সুচারু শিল্পীত্ব। গড়াই নদীর প্রমত্তা রূপ সব সৌন্দর্যকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাপড়ের হাট কুমারখালী শহর দেশের অর্থনীতিতে একটি বিশিষ্ট নাম। রবীন্দ্র মাসনে বিশ্ব প্রকুতির সাথে প্রথম শুভ দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল এই কুমারখালীরই এক নিভৃত পল্লীতে। সরকারীভাবে অনেক প্রচেষ্টার ফলে শহর হতে ৩.৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে ১৯৬৭-৬৮ আর্থিক বতসরে একটি গ্রোয়েন নির্মিত হয়। দ্বিতীয় গ্রেয়েনটি পৌরসভা কার্যালয়ের নিকটে তৈরি হলে সাময়িকভাবে ভাঙ্গন নোধ হয়। কিন্তু আবারও খেয়ালী নদীর খেয়ালীপনায় পৌরসভার সীমানা কমাতে ব্যস্ত হয় গড়াই নদীর বাঙ্গন। সাময়িকভাবে পারকুপাইন দেওয়া হলেও ভাঙ্গন রোধে তা কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। যার ফলে নিশ্চহ্ন হয় এম. এন. উচ্চ বিদ্যালয় ও কুমারখালী কলেজের দুই তৃতীয়াংশ। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির লালন ক্ষেত্র, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবান্ধিক, ঔপন্যাসিক, ঐতিহাসিক, আউল-বাউল ও তান্ত্রক সাধকগণের পদচারণায় ধন্য কুমারখালী পৌর শহর অস্তায়মান সূর্যের মত দিনের শেষ প্রহরের বাঁশি বাজানোর অপেক্ষায় আছে। অচিরেই এই সর্বনাশা ভাঙ্গন রোধ কল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা যদি গ্রহণ করা না হয় তাহলে পৌরসভার পাচীন মূল অংশের অবশিষ্টটুকুও কুমারখালী শহরের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এ বিষয়ে সরকারের শুভদৃষ্টি ও বোধোদয় হলে হয়তো পৌরসভার কার্যালয়সহ পৌর শহর কুমারখালীকে ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভভ হতো। তা না হলে অচিরেই এ শহরের মূল কাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
কুমারখালী পৌরসভার চেয়ারম্যান পরিচিতি ১৯১৮ সাল হইতে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন যারাঃ ১. -- ডাঃ নবদ্বীপ চন্দ্র পাল ২. -- প্রমথ নাথ চক্রবর্তী ৩. -- নমনী মোহন পাল ৪. ১৯৫৩-৬০ ডাঃ এম, মোজাফ্ফর হোসেন ৫. ১৯৬০-৬৫ জনাব আফছার উদ্দিন জোয়ার্দার ৬. ১৯৬৫-৭২ জনাব আব্দুস ছাত্তার মিয়া ৭. ১৯৭৪-৭৭ জনাব আব্দুর রহিম জোয়ার্দার ৮. ১৯৭৭-৮২ জনাব জবেদ আলী মোল্লা ৯. ১৯৮৪-৮৮ জনাব নুরুল ইসলাম আনছার ১০. ১৯৮৯-৯১ জনাব নুরুল ইসলাম আনছার ১১. ১৯৯৩-৯৮ জনাব নুরুল ইসলাম আনছার ১২. -- জনাব নুরুল ইসলাম আনছার ১৩. -- জনাব নুরুল ইসলাম আনছার ১৪. -বর্তমান জনাব নুরুল ইসলাম আনছার
মীর আরশেদ আলী |