|
অমৃত সন্ধানে চলো যাই: রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী |
|
|
|
Monday, 18 May 2009 |
বাংলাদেশের মানুষের কাছে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের রবীন্দ্র ‘কুঠিবাড়ি’ এ কারণেই আলাদা মর্যাদা নিয়েছে যে, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম এই কবির সঙ্গে এদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি এ স্থানই। কবিগুরুর এই বাসস্থানটি ফলে এদেশের মানুষের কাছে আলাদা মর্যাদাও পেয়েছে। আর তিনিও এখানে বসে নানা রচনা তৈরি করেছেন। লিখেছেন তার নোবেল বিজয়ী গীতাঞ্জলি’র অংশ বিশেষসহ আরো অন্যান্য লেখা। ফলে মহান এই কবির জীবনের বহু স্মৃতি জড়ানো শিলাইদহ পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি ভূ-খণ্ড সৃষ্টির পর থেকে অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে। কুষ্টিয়াবাসী কবির স্মরণে আয়োজন করছেন প্রতিবছর রবীন্দ্র মেলার। তখন থেকে চলতে থাকা এ মেলা ৭/৮ বছর আগে থেকে আয়োজন করছে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন। এবার মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘বাংলালিংক।’

২৫ ও ২৬ বৈশাখ দু’দিন ধরে চলে ‘রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী মেলা’। ২৫ বৈশাখ সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে কুমারখালী উপজেলার শিল্পকলা একাডেমি ও শীলন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের বক্তব্য ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি কর্ম নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন রবীন্দ্র গবেষকরা। এবারের মেলার শ্লোগান ‘অমৃত সন্ধানে চলো যাই’।
রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করেছিল শিলাইদহ। এখানে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন অসাধারণ কবিতা। সময় পেলেই ছুটে এসেছেন পদ্মাবোটে চেপে কাছারি বাড়িতে। তাঁর পদচারণা ছিল বিশ্বব্যাপী, তাকে বলা হয় বিশ্বমানব। অনেক জায়গার মতো তার পদধুলি পড়েছিল এই বাংলাদেশে বিশেষ করে শাহজাদপুর, নঁওগার পতিসর এবং কুষ্টিয়ার শিলাইদহে। নিজের জমিদারীর বদৌলতে রবীন্দ্রনাথের পদচারণা পদ্মাপাড়ের ছায়া সুনিবিড় শিলাইদহে ছিল একটু বেশি। তাই কুষ্টিয়াবাসীও পরম মমতা-ভালোবাসায় আগলে রাখছে প্রিয় কবির সকল স্মৃতি। সেই স্বাধীনতার আগ থেকে কুষ্টিয়াবাসী তাঁর জন্ম দিন উপলক্ষে আয়োজন করেছে ‘রবীন্দ্রমেলা’।
২৫ শে বৈশাখ, শুক্রবার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার শিলাইদহ গ্রামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪৮তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দু’দিনের অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিনে আয়োজিত আলোচনা সভায় কুষ্টিয়া কবিগুরুর স্মৃতিধন্য শিলাইদহে একটি শান্তিনিকেতনের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবী জানান কুষ্টিয়া সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জমির উদ্দিন। তিনি জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “বঙ্গবন্ধু ’৭২ সালে কুষ্টিয়া এসে এখানে একটি শান্তিনিকেতনের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের সেই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবী জানাচ্ছি।” তিনি নিজের একথার স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে ৭২ সালের জুলাই মাসে ভারতের আনন্দ বাজার প্রত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন। যেখানে বঙ্গবন্ধুর এই আশার কথা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
শিলাইদহে রবীন্দ্র কুঠি বাড়িতে আয়োজিত এ আলোচনা সভার অন্যান্য বক্তারা এই দাবীর পক্ষে তাদের সমর্থন জানান। আর জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান তাদের দাবীটি সরকারের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দেন।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নরুজ্জামানের বক্তৃতায় উঠে আসে কাছারী বাড়ির পূর্বের লাল রঙটি ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব।

আলোচনা শেষ হলে কুষ্টিয়া জেলার একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে নানা আয়োজন। এ সময়টাতে মেলায় আগত দর্শক শ্রোতারা রবীন্দ্র সংগীত, নৃত্য, কবিতা উপভোগ করেন। পরদিন ৯ মে শনিবার ছিল উৎসবের ২য় দিন। এদিনও সকাল ৯টা ৩০ মিনিট থেকে আলোচনা অনুষ্ঠান ও দুপুর ১টা থেকে রাত ১২টা ৩০মিনিট পর্যন্ত চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এদিন স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি শান্তিনিকেতন থেকে আগত অতিথি অনুপূর্বা রায় এবং সৌগত ধর চৌধুরী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। নাচ, গান আর কবিতা আবৃত্তি এই সবকিছুতেই রবীন্দ্রনাথ মিশে ছিলেন গভীরভাবে।
নাচে- গানে বিশ্বকবিকে দু- দিনের অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে স্মরণ করে- পান্টি সংগীত একাডেমি, কিন্নরী সংগীত নিকেতন, কলতান সংগীত একাডেমি, ভেড়ামারা সাংস্কৃতিক একাডেমি, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী কুষ্টিয়া জেলা সংসদ, শিশু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিরাইদহ রবীন্দ্র সংসদ, কুষ্টিয়া মিউজিক ক্লাব, কুষ্টিয়া আবৃত্তি পরিষদ প্রমুখ সাংস্কৃতিক সংগঠন।
মেলায় ঘোরাঘুরির ফাঁকে কাছারি বাড়িটাও ঘুরে যেতে ভুলে না কেউ। কাছারি বাড়ির দেয়ালে সাজানো নানান ফটোগ্রাফ মুগ্ধ করে সবাইকে। কেউ ছুঁয়ে দেখেন রবি ঠাকুরের ব্যবহৃত পালকি, চেয়ার, সিন্দুক, সেলফসহ নানান আসবাবপত্রগুলো। রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোও কম বিস্ময় জাগায় না দর্শকের চোখে।
এককালে এই বাড়ির ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত পদ্মা নদীর মোহনীয় রূপ। এখানে বসেই কবি মগ্ন থাকতেন কাব্য চর্চায়।
সেদিন ছিল পূণিমা। জানা নেই, হয়তো এমনই কোন এক পূর্ণিমারাতে কবি রচনা করেন, ‘চাঁদের আলো বাঁধ ভেঙ্গেছে, উছলে পড়ে আলো, ও রজনী গন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো...।’ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল শিলাইদহের কাছারি বাড়ির উঠানে আগত হাজারো মানুষ।
উল্লেখ্য, নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়ার এই কুঠি বাড়িতেই রচনা করেছিলেন তার অমর কর্ম ‘গীতাঞ্জলি’র কিছু অংশ। আর বাড়িটিতে তার স্মৃতিধন্য নানা ব্যবহার্য জিনিসপত্র রয়েছে। বর্তমানে বাড়িটি সরকারের তত্বাবধানে রয়েছে।
শিলাইদহের এই বাড়ির পাশেই বসেছিল গ্রাম্য মেলা। কোনো রকমের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই গ্রামীনমেলা শুরু হয়েছিল কবির জন্মতিথির একদিন আগে থেকেই। কুঠিবাড়ির চারদিকে প্রায় দুই কি তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে জমে ওঠা এই মেলায় কাঠের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছিল। মেলায় আশা দর্শনাথীদের আকৃষ্ট করেছে কুঠিবাড়ির মুল গেট থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণ দিকের মূল রাস্তা পর্যন্ত প্রায় ৪০টি দোকান। এসব দোকানের মূল আকর্ষণ ছিল একতারা। আর মেলার একপাশে আয়োজন করা হয়েছিল লাঠিখেলা, পুতুল নাচ এবং নাগোরদোলার। বাঙালি সংষকৃতির চর্চার মাধ্যমে বাঙালির কবিকে স্মরণের উদ্যোগ এ বছর নানা দর্শনার্থীর আগমনের মাধ্যমে জাঁকজমকের মাধ্যমে পালিত হয়েছে।
Resource:
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/মীর সামী/ওএফএস/মে ১২ http://glitz.bdnews24.com/details.php?catry=15&showns=528 |